সাদাপাথরের ভোলাগঞ্জ ও উৎমাছড়ায় একদিন

নাহিয়ান রাহী
এবারের ট্যুরটা ছিল ‘ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর’। যদিও গতবছর ঘুরে এসেছিলাম। এই পর্যটন স্বর্গের নাম শুনে থাকবেন, ইদানীং বেশ জনপ্রিয়। গতবছর গিয়ে যেখানে দুই একটা ছোট গ্রুপ ছাড়া কাউকে পাই নি, সেখানে এই ঈদে শ’দুয়েক মানুষ দেখে আসলাম। গতবার এতোই ভালো লেগে গিয়েছিল যে আবারো যাওয়ার জন্য মন আকুপাকু করে উঠলো। মানুষ আগের তুলনায় একটু বেশি কিন্তু স্বাদ আমার কাছে আগের মতোই লেগেছে।

তবে যারা ভীড় পছন্দ করেন না, তাদের জন্য ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর এর কাছেই লুকিয়ে আছে আরেক প্রাকৃতিক স্বর্গ। নাম উৎমাছড়া।

সাদাপাথর থেকে উৎমাছড়ার পার্থক্য মূলত পানির গভীরতায়। ভোলাগঞ্জ সাদাপাথরে বর্ষার এই মৌসুমে যেখানে কয়েক হাত গেলেই আর ঠাঁই পাওয়া যায় না, সেখানে উৎমাছড়া অনেকটাই সাবলীল।

ভোলাগঞ্জ সাদাপাথরে যারা সাঁতার পারেন না তাদের জন্য খুবই রিস্কি, পানির স্রোতও খুবই প্রবল। আমি একবার ওপারে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলাম স্রোতের সাহায্য নিয়ে, কিন্তু মাঝপথে পেশি কাজ করা কমায় দিলো, শরীর অবশ হওয়া শুরু হয়েছিল। তাই ওপারে যাওয়ার চেষ্টা না করার অনুরোধ রইলো, যদিও দেখবেন অনেকে দিব্যি চলে যাচ্ছে। কিন্তু এটা খুবই রিস্কি।

উৎমাছড়ার পানির গভীরতা সাদাপাথরের তুলনায় অনেক কম, সবখানেই ঠাঁই পাওয়া যায়, এ পাড় থেকে ওপারে যাওয়া তাই কম রিস্কি। তবে পানির গভীরতা কম হলেও পানির ঢল ও পরিমান ভালোই আছে। ক্ষীপ্র ও বিশাল পরিসরে পানি আসতে থাকে। এখানকার পাথরগুলো ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর থেকে অনেক বড়! পাথর সাইজে বড় হওয়ার কারনে পানি বেশি বাধা পেয়ে পাথরের পাশ দিয়ে প্রবল বেগে প্রবাহিত হয়, নিজেকে এই বেগের সামনে আটকিয়ে রাখা খুব কঠিন। তবে ভয় নেই এখানে আপনি ডুববেন না, তাহলে আটকিয়ে রাখার চেষ্টা কেন? ছেড়ে দিন না নিজেকে স্রোতের কাছে, দেখা যাক কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যায়! (পাথরে ঘষা খাওয়া থেকে সাবধান!)

বিকেলে, সূর্য যখন নিভু নিভু, সোনালি আলোর প্রতিফলনে পাথরে ধাক্কা খাওয়া প্রবহমান পানিকে মনে হয় গলিত সোনা, মনে হয় গলিত সোনা যেন চাড়পাশে ছিটকে পড়ছে! চলে যান না একদিন সোনা গায়ে মাখাতে!

যেভাবে যাবেন
ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর ও উৎমাছড়া ভ্রমন একটা আরেকটার Substitute না হয়ে Complementary হতে পারে, মানে একইদিনে ট্যু ইন ওয়ান ভ্রমন। আলাদা করে উৎমাছড়া যাওয়ার জন্য সময় বের করার দরকার নেই।

ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর যান সিলেট নগরীর আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে ভোলাগঞ্জ ১০ নম্বর ঘাট পর্যন্ত সিএনজি রিজার্ভ করে। (আম্বরখানায় সিএনজি রিজার্ভ করার সময় ড্রাইভারকে এটা বলে নিবেন, নইলে পড়ে ভেজাল করতে পারে)।

ট্যুরের গ্রুপ হলে বাস ভাড়া করে নিতে পারেন, পুরোদিনের জন্য ৬ হাজার টাকা। আগের মতো রাস্তার ভয়াবহতা নেই, প্রায় ৭০-৮০% সংস্কার কাজ সম্পন্ন। আগে যেখানে আড়াই ঘন্টা লাগতো, এখন মাত্র দেড় ঘন্টা বা তারও কম সময় লাগবে।

ভোলাগঞ্জ ১০ নম্বর ঘাট থেকে নৌকায় ১০ মিনিটে ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর। আগে নৌকা ভাড়া যে যা পারে তা ডিমান্ড করতো, কিন্তু এখন প্রশাসন থেকে নির্ধারিত ৮০০ টাকা যাওয়া-আসা। এক নৌকায় ১২-১৩ জন বা চাইলে আরেকটু বেশিও যাওয়া যায়, আপনারা সংখ্যায় কম হলে আশেপাশে চোখ বুলিয়ে অন্য কোনো গ্রুপের সাথে গোপন আঁতাত করে ফেলুন, কারন এখানকার মাঝিরা সুযোগ সন্ধানী।

সাদাপাথরে ভ্রমন শেষে ঘাটে চলে আসুন, এখান থেকে দোয়ারবাজার বা দায়ারবাজার। চোখে দেখা যায়, নদীর ওপারে। ভাড়া জনপ্রতি ১০ টাকা। তবে আপনাকে রিজার্ভ করে নিতে হতে পারে জনশূন্যতার কারনে, ১০০-২০০ নিবে আপনাদের গ্রুপের মানুষের সংখ্যা বিবেচনা করে।

দয়ারবাজার ঢুকে মানুষকে জিজ্ঞেস করে চড়ারবাজার যাওয়ার সিএনজি স্টেশন খোঁজে নিতে হবে। এখানেই উৎমাছড়া।

সিএনজি রিজার্ভ করে নিলে উৎমাছড়ার একটু আগ পর্যন্ত গিয়ে থামে, বাকী পথ হেঁটেই যাবেন, ৫ মিনিট লাগবে। এখানে নৌকার কোনো ব্যাপারস্যাপার নেই, ড্রাইভারকে বলে নিবেন আপনারা উৎমাছড়া যেতে চান। রিজার্ভ ভাড়া ৩৫০ টাকা। অথবা রিজার্ভ ছাড়া জনপ্রতি ৩০ টাকা। তবে সেক্ষেত্রে আপনাকে হাঁটতে হবে বেশি। হাঁটার পথে স্থানীয় মানুষের সাহায্য নিন চিনে নিতে। এখানকার রাস্তা ভালো না, ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর থেকে উৎমাছড়ার দূরত্ব ৭-৮ কিলোমিটার হবে, যেতে ঘন্টাখানেক সময় লাগে। ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর দুপুর ২-৩টা পর্যন্ত অবস্থান করে তারপর উৎমাছড়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিন। বিকাল চারটা থেকে ডুবন্ত সূর্য পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করুন। অনেক সময় স্থানীয় প্রশাসন বিশেষ করে বিজিবি বাঁশি বাজিয়ে অবস্থানরতদের সন্ধ্যার আগেই সরে যাওয়ার জন্য নির্দেশনা দেয়। তবে চেষ্টা করুন, সূর্যাস্ত দেখে আসতে।

বিঃদ্রঃ উৎমাছড়া যাওয়ার সময় পথঘাট ভালোভাবে খেয়াল করে যাবেন, কারন ব্যাক করার সময় সব তালগোল পাকিয়ে যেতে পারে। এই সিকুয়েন্স মনে রাখুন, ১০ নম্বর ঘাট > দয়ারবাজার > চড়ারবাজার > উৎমাছড়া;
ব্যাক করার সময় এই সিকুয়েন্স জাস্ট রিভার্স করবেন; তবে দয়ারবাজার পর্যন্ত। অতঃপর দয়ারবাজার থেকে স্টেশন খোঁজে সিএনজি দিয়ে সিলেট ব্যাক করুন।

আরেকটা কথা, আম্বরখানা থেকে সিএনজি করে ভোলাগঞ্জ ১০ নম্বর ঘাটে না গিয়ে সরাসরি দয়ারবাজার যাওয়া যায়, সেখানে ঘাট আছে, এই ঘাট থেকেও নৌকা ভাড়া করে সাদাপাথর যাওয়া যায়। আম্বরখানা থেকে সিএনজি রিজার্ভ না করে লোকালেও যাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে সিএনজি আপনাকে ১০ নম্বর ঘাট নামিয়ে দিবে না, দয়ারবাজার নামিয়ে দিবে। দয়ারবাজার থেকে নৌকায় সাদাপাথর। আবার এই দয়ারবাজার থেকেই সিএনজিতে চড়ারবাজার, সেখান থেকে হেঁটে উৎমাছড়া। মানে, সবকিছুর সেন্টার দয়ারবাজার। সিলেট ব্যাক করার সময় ১০ নম্বর ঘাট থেকে গাড়ি পাবেন না, দয়ারবাজার থেকে ব্যাক করতে হবে।

আপনাদের ভ্রমণ শুভ হোক।

লেখক: অর্থনীতি ২০১৪-১৫ ব্যাচ, শাবিপ্রবি, সিলেট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *