হিমালয়ের সৌন্দর্য নৈনিতালে!

পার্থ চক্রবর্তী
কৌশানির ওই ভোর টা সারাজীবনেও ভুলবোনা। আমরা ছিলাম হোটেল উত্তরাখণ্ডের দোতলার ঘরে। এতো ভালো ভিউ কৌশানির আর কোথাও নেই। না গান্ধী আশ্রমেও না। যাই হোক ভোর ৫ টা। হোটেলের ছাদে এলাম। ডিসেম্বরের কনকনে হাওয়ার কামড় সূচের মতো বিঁধছে গায়ে। ভারী জ্যাকেট মাফলার গ্লাভস পরেও দাঁড়িয়ে থাকা দুষ্কর। কিন্তু পা আর চোখ দুই যে আটকে গেছে। হোটেলের সামনে অনন্ত উপত্যকা। আর তারপর ঢেউএর তরঙ্গের মতো সার বেঁধে হিমালয়। আর সবচেয়ে ওপরে কয়েকশ মাইল জুড়ে শুধুই বরফশৃঙ্গ।

গারোয়াল হিমালয়ের চৌখাম্বা থেকে শুরু, শেষ হচ্ছে পঞ্চচুল্লি দিয়ে। মাঝে সারি বেঁধে রয়েছে নন্দঘুণ্টি,নন্দাদেবী,ত্রিশুল,নন্দকোট প্রমুখ নানা গিরিশৃঙ্গ। আমি আর হিমালয়ের মাঝে আর কেউ নেই। এমন সময় ভোরের সূর্যের আগমন বার্তা ছড়াল আকাশ জুড়ে। লাল হলো আকাশ। সেই লালিমায় রাঙা হতে শুরু করল গিরিরাজের মুকুটেরা। প্রথম আলো পড়লো ত্রিশূলে।আমি স্তম্ভিত। এতো অপূর্ব। এরপর গোটা হিমালয় জুড়ে লালের খেলা। শেষ হলো পঞ্চচুল্লি দিয়ে।

ট্যুরের শুরুটা কিন্তু এতো ভালো ছিল না। লালকুয়া এক্সপ্রেস ধরে লালকুয়া নেমে নৈনিতালে যাবার জন্য একটা গাড়ি নিলাম। ড্রাইভার রমেশ ভাই বেশ ভদ্র। আমাদের প্ল্যান শুনল। আমরা যাবো নৈনিতাল, মুক্তেশ্বর, কৌশানি, চকৌরি, বিরথি ফলস, মুন্সিয়ারি। তার সঙ্গেই ঘোরানোর চুক্তি হলো। ৫ বছর আগে, পার ডে ১০০০ করে চুক্তি হয়েছিল। এখন নিশ্চয়ই অনেক বেড়েছে। ৯৫৩৬৫০২২৪৫ গাড়ির মালিক কবিন্দর সিং। ৯৭৫৬৮২৭৬৬৫ ড্রাইভার রমেশ। কথা বলতে পারেন। যথেষ্ট ভরসাযোগ্য মনে হয়েছিল। কোথায় কোন হোটেলে থাকবো সে-ই ঠিক করে দিয়েছিল।

নৈনিতালে দুদিন ভালোই কাটল। সাততাল দেখলাম। রোপওয়ে থেকে নৈনি লেকের অসাধারন রূপ দেখলাম। পরের দিন যাচ্ছি মুক্তেশ্বর। আকাশ মেঘে ঢাকা। ভিজে ওয়েদারে ঠান্ডা ক্রমেই বাড়ছে। যখন মুক্তেশ্বর ঢুকলাম বিকেল হয়ে গেছে। হোটেলে ঢুকেই গেলাম কয়েকশো মিটার দূরে চাউলি কি জালি। পাহাড়ের প্রান্ত শেষ তারপর কয়েক হাজার ফুটের খাড়াই খাদ। বুক কেঁপে যায় নিচের দিকে তাকালে। মেঘের ফাঁকে হঠাৎ দেখা দিল অস্তগামী সূর্য। অপরূপ শোভা তার।

কিন্তু তার পরেই হলো সমস্যা, ১০ বছরের ভাইপোর শরীরটা খারাপ করলো। ঠাণ্ডা ক্রমে বাড়ছে। বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম সবাই। ট্যুর সবটা বাকি। জার্নির ধকল নেবে কি করে? আর মুন্সিয়ারির তাপমাত্রা দেখাচ্ছে মাইনাস ১০। মন পুরো বিপর্যস্ত। শরীর খারাপ,তার ওপর পুরো মেঘ,হিমালয়ের কিচ্ছু দেখা পাচ্ছিনা। ভরসা দিলো রমেশ ভাই। অতো লং জার্নি করবেন না। কাল চলুন আলমোরা। ভালো হোটেলে রাখবো। বাজার শহর প্রকৃতি সব পাবেন ওখানে। একদিন যাবো যোগেশ্বর। আরেকদিন বিনসর। তারপর দিন কউশানির হোটেল। ওখানে এক রাত থেকে রানীখেতে একরাত। শেষে যাবো শীতলাখেত। জার্নি কম হবে। ভালো ঘুরবেন। সেই মতোই চলতে লাগলাম। উপায়তো নেই ওকেই ভরসা করা ছাড়া।

আলমোরা তে রাখলো শিখর হোটেলে। সস্তা অথচ বেশ ভালো হোটেল। সমস্ত ফ্যাসিলিটি আছে। খাবার দাবারও দারুন। সেখান থেকে গেলাম জাগেশ্বর মন্দির। প্রাচীন এই মন্দিরের কারুকাজ মন ভরালো। সকালের হিমেল হাওয়ায় মন্দিরের প্রাঙ্গনে বরফ জমে আছে। আর সেখান থেকে ফেরার সময় সরল মেঘের চাদর। শ্বেত শুভ্র হিমালয়ের শৃঙ্গ দেখা দিল। তারপর থেকে দুনয়ন ভরে শুধু পিক দেখা। কৌশানির কথা শুরুতেই বলেছি।

এরপর বিনসর। জঙ্গল ঘেরা পাহাড় হেঁটে উঠলাম বিনসর। ঝলমলে ওয়েদারে ভাইপো অর্ঘর উদ্যম দেখার মতো।ম্যাপ নিয়ে একের পর এক শৃঙ্গ চিনছে। বিনসর হলো পিক দেখার স্বর্গ। ওদিকে গাড়োয়াল হিমালয়ের চৌখাম্বা থেকে কুমায়ুনের সব তার পর অবাক করে দিয়ে ডানা মেলল নেপাল হিমালয়ের ফিশটেল আর অন্নপূর্ণা। আমরা স্তম্ভিত এই রূপ দেখে। একের পর এক শৃঙ্গ তাদের রূপ মেলে ধরছে। হিমালয় উজাড় করে দিচ্ছে নিজেকে। এই রূপের কাছে সব তুচ্ছ। এরপর রানিখেত। এই শৈলশহরও বেশ সুন্দর।

কিন্তু আলাদা করে বলবো শীতলাখেতের কথা। আমায় মুগ্ধ করেছে এই জায়গা। জঙ্গল ঘেরা রাস্তা দিয়ে গাড়ি রানিখেত থেকে এসে থামল শীতলাখেতে। একটাই হোটেল, নাম শীতলম। অফ সিজন। তাই ৫ তলা হোটেলে আমরাই একমাত্র অতিথি। হোটেলের পিছনেই জঙ্গল। হোটেলের সামনের রাস্তা ধরে ৫০০ মিটার গেলেই গহীন জঙ্গল। লোকাল লোকেরা দোকান নিয়ে বসে রাস্তার ঘুমটিতে। ৫ টা বাজলেই দোকান বন্ধ করে দলবেঁধে ফিরে যায় গ্রামে। তাদের কথায় সন্ধ্যে হলেই এই অঞ্চল বন্য জানোয়ারের মুক্ত রাজ্যে পরিনত হয়। ভালুক চিতা সবই আসে এখানে। তাই হোটেল থেকে বের হওয়া সন্ধ্যের পর একদম মানা। সারা রাত গা ছমছমে পরিবেশ। নির্জন নিরালা পুরি। পিছনের জঙ্গল থেকে ভেসে আসা নানা অজানা শব্দ। রোমাঞ্চে ঘুম হলো না ভালো করে।স কালে জঙ্গলের রাস্তা ধরে তিন কিলোমিতার ওপরে একটা মন্দিরে গেলাম। বেশ লাগলো জঙ্গলের ওই পথ।নানা পাখির কুজন মন ভরাল, নানা রঙের পাখি মুগ্ধ করলো দৃষ্টিকে। অদ্ভুত ভালোলাগা জড়িয়ে গেলো জায়গাটার সাথে।

এরপর আবার ফেরা নৈনিতাল। মন কানায় কানায় পূর্ণ। যেদিন ট্রেন আগের রাতে বৃষ্টি শুরু হলো। সকালে উঠে দেখি একটু ওপরের পাহাড় বরফে সাদা। গাড়ি নিয়ে আবার গেলাম বরফের রাজ্যে। সত্যি এতো পাওনা ছিল ভাবতেই পারিনি। নৈনিতাল নয়নে আঁকা হয়ে রইলো চিরকালের জন্য।

যেসব হোটেলে ছিলাম, আলমোড়ায় শিখর, কৌশানিতে উত্তরাখণ্ড, শীতলাক্ষেতে শীতলম। প্রত্যেকটা টপ হোটেল। ভাড়াও ঠিকঠাক। নেটে সার্চ করলে সব পাবেন।

লেখক: শিক্ষক, হুগলী, পশ্চিমবঙ্গ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *