পানাম নগরী ‘দ্য লস্ট সিটি’

ঢাকা থেকে একদিনের ভ্রমনের জন্য অন্যতম একটি আদর্শ স্থান হতে পারে “হারানো নগরী” হিসেবে পরিচিত “পানাম নগরী”।

অবস্থান
ঢাকা থেকে ২৭ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে নারায়ণগঞ্জ জেলার, সোনারগাঁওতে অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন শহর “পানাম নগরী”। সোনারগাঁওর ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই নগরী গড়ে ওঠেছে।

সোনারগাঁওর ইতিহাস
রাজধানী ঢাকা থেকে ২৫ কিলোমিটার পূর্বদিকে সোনারগাঁওয়ের অবস্থান। মধ্যযুগে মুসলিম সুলতানদের রাজধানী ছিল সোনারগাঁও।

জনশ্রুতি আছে, সোনারগাঁয়ের প্রাচীন নাম ছিল সুবর্ণবীথি বা সুবর্ণগ্রাম। তবে এই নামকরণ নিয়ে অনেক মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, মহারাজ জয়ধ্বজের সময় এ অঞ্চলে সুবর্ণবৃষ্টি হয়ছিল, সে থেকেই এই স্থানের নাম সুবর্ণ গ্রাম যা পরবর্তীতে মুসলিম আমলে সোনারগাঁও হিসেবে পরিচিত পায়। আবার অনেকে বলেন, বারভূঁইয়া প্রধান ঈসা খাঁর স্ত্রী সোনাবিবির নামানুসারে এই অঞ্চলের নামকরণ হয়েছে সোনারগাঁও। তবে নাম নিয়ে নানা মতভেদ থাকলেও ঐতিহাসিক ও দিক দিয়ে এ অঞ্চল ছিল বাংলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সোনারগাঁওয়ের পূর্বে মেঘনা নদী, দক্ষিণ-পশ্চিমে শীতলক্ষ্যা, দক্ষিণে ধলেশ্বরী এবং উত্তরে ব্রক্ষ্মপুত্র দ্বারা পরিবেষ্টিত। নদীমাতৃক তৎকালীন বাংলায় তাই সোনারগাঁও তার ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য পেয়েছিল বিশেষ মর্যাদা।

পানাম নগরী
প্রাচীন সোনারগাঁওর নগর ছিল তিনটি। সেগুলো হল-বড় নগর, খাস নগর, পানাম নগর। তার মধ্যে পানাম নগর ছিল বিখ্যাত এবং গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গ অঞ্চলের তাঁত ব্যবসায়ীদের মূল কেন্দ্রবিন্দু ও আবাসস্থল ছিল “পানাম নগরী”। পঞ্চদশ শতক থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত এক সমৃদ্ধ জনজীবন ছিল এই “পানাম নগরী”তে। এ স্থান থেকে ব্যবসায়ীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে তাঁত ব্যবসা পরিচালনা করতেন। বাংলার মসলিনসহ অন্যান্য তাঁত শিল্পের প্রচার প্রসার ও ব্যবসায়ের তীর্থস্থান এ “পানাম নগরী”। এখানে সরু রাস্তার দুই ধারে গড়ে উঠেছিল অট্টালিকা, সরাইখানা, মসজিদ, মন্দির, মঠ, ঠাকুরঘর, গোসলখানা, কূপ, নাচঘর, খাজাঞ্চিখানা, টাকশাল, দরবার কক্ষ, গুপ্তপথ, প্রশস্থ দেয়াল, প্রমোদালয় ইত্যাদি।

“পানাম নগরী” নিখুঁত নকশার মাধ্যমে নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে “পানাম নগরী”তে প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত ৫২টি ভবন অবশিষ্ট রয়েছে। “পানাম নগরী”র মাঝে যে রাস্তা চলে গেছে এর উত্তর পাশে ৩১ টি এবং দক্ষিণ পাশে ২১টি স্থাপনা রয়েছে। স্থাপনাগুলোর স্থাপত্যে ইউরোপীয় শিল্পরীতির সাথে মুঘল শিল্পরীতির মিশ্রণ লক্ষ করা যায়। এ নগরীতে ৪০০ বছরের পুরনো মঠবাড়ি দেখা যায়। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই উপাসনালয়, গোসলখানা, পান্থশালা, দরবার কক্ষ, কূপসহ আবাস উপযোগী নিদর্শন রয়েছে। এছাড়া এ নগরীতে রয়েছে শত বছরের পুরনো টাকশাল বাড়ি ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নীলকুঠি।

নগরীর পানি সরবরাহের জন্য দুই পাশে খাল ও পুকুরের অবস্থান লক্ষ করা যায়। পানামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে পঙ্খীরাজ খাল। এ খাল পানামের গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলো ছুঁয়ে পূর্বদিকে মেনিখালি নদ হয়ে মেঘনা নদীতে মিশেছে।

লোক ও কারুশিল্প যাদুঘর
আবহমান গ্রামবাংলার লোক সাংস্কৃতিক ধারাকে বিকশিত করার উদ্যোগে ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন সোনারগাঁওয়ের ঐতিহাসিক “পানাম নগরী”র একটি পুরনো বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন।

পরে ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে ১৫০ বিঘা আয়তনের কমপ্লেক্সে খোলা আকাশের নিচে বাংলার প্রকৃতি ও পরিবেশে গ্রামীণ রূপকেন্দ্রিক বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের শৈল্পিক কর্মকাণ্ডের পরিচয় তুলে ধরতে শিল্পী জয়নুল আবেদীন এই জাদুঘর উন্মুক্ত পরিবেশে গড়ে তোলার প্রয়াস নেন এবং বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন কমপ্লেক্সটি প্রায় ১০০ বছর পুরনো সর্দারবাড়িতে স্থানান্তরিত হয়।

সর্দারবাড়িতে ১০টি গ্যালারি রয়েছে। গ্যালারিগুলোতে কাঠ খোদাই, কারুশিল্প, পটচিত্র ও মুখোশ, আদিবাসী জীবনভিত্তিক নিদর্শন, গ্রামীণ লোকজীবনের পরিবেশ, লোকজ বাদ্যযন্ত্র ও পোড়ামাটির নিদর্শন, তামা-কাসা-পিতলের নিদর্শন, লোহার তৈরি নিদর্শন, লোকজ অলঙ্কারসহ রয়েছে বহু কিছু।

ভবনটির সামান্য আগে রয়েছে জয়নুল আবেদীন স্মৃতি জাদুঘর। এই ভবনটিতে মাত্র দু’টি গ্যালারি। এই দু’টি গ্যালারির মধ্যে একটি গ্যালারি কাঠের তৈরি, যা প্রাচীন ও আধুনিককালের নিদর্শনসমৃদ্ধ। তা ছাড়া বাংলাদেশের প্রাকৃতিক, বৈশিষ্ট্য কাঠ এবং কাঠ থেকে বিভিন্ন কারুপণ্য তৈরি এবং সর্বশেষ বিক্রির সামগ্রিক প্রক্রিয়া, অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে সুন্দর মডেল দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

এই দু’টি ভবনের বাইরে রয়েছে পাঠাগার, ডকুমেন্টেশন সেন্টার, সেমিনার হল, ক্যান্টিন, কারুমঞ্চ, গ্রামীণ উদ্যান ও বিভিন্ন রকমের বৃক্ষ, মনোরম লেক, লেকের মাঝে ঘুরে বেড়ানোর জন্য নৌবিহার, মৎস্য শিকারের সুন্দর ব্যবস্থা ও পঙ্খিরাজ নৌকা।

কারুপল্লীতে বৈচিত্র্যময় দোচালা, চৌচালা ও উপজাতীয়দের আদলে তৈরি ঘরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অজানা, অচেনা, আর্থিকভাবে অবহেলিত অথচ দক্ষ কারুশিল্পীর তৈরি বাঁশ, বেত, কাঠ খোদাই, মাটি, জামদানি, নকশিকাঁথা, একতারা, পাট, শঙ্খ, মৃৎশিল্প ও ঝিনুকের সামগ্রী ইত্যাদি কারুপণ্যের প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থা
ঢাকার গুলিস্তান থেকে স্বদেশ বা বোরাকের এসি পরিবহনে ওঠে নামবেন মোরগাপাড়া চৌরাস্তা। ভাড়া নিতে পারে ৪০, ৪৫ অথবা ৫০ টাকা। সময় লাগতে পারে ১ ঘণ্টা, তবে শুক্রবার ছাড়া অন্যদিন হলে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা হাতে নিয়ে বেরুতে হবে। মোরগাপাড়া চৌরাস্তায় নেমে দেখবেন অটো দাঁড়ানো আছে। সেখানে থেকে “পানাম নগরী”র ভাড়া ১০ থেকে ৩০ টাকা। অথবা গুলিস্তান থেকে চিটাগাং রোডের বাসে করে চিটাগাং রোড যাবেন। সেখান থেকে সিএনজিতে করে যেতে পারেন। আবার বাসে করেও যেতে পারেন। বাসে গেলে নামতে হবে পানাম নগর বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে রিকশায় সোনারগাঁও জাদুঘর। আর নিজের গাড়ি থাকলে তো কথা-ই নেই।

অন্যান্য
পানাম সিটিতে প্রবেশমূল্য ২০ টাকা। জাদুঘরে প্রবেশ মূল্য ৩০ টাকা। প্রতি বুধ ও বৃহস্পতিবার জাদুঘর বন্ধ থাকে। অর্থাৎ ১৫০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে যাতায়াত সম্ভব।

ছবি তোলার জন্য সেখানে আলাদা করে কোন ব্যবস্থা নেই। তাই ক্যামেরা ও ছবি তোলার অন্যান্য যন্ত্রপাতি সাথে নিয়ে যাওয়া ভালো। ঢাকা থেকে সরাসরি গেলে খাবার সাথে করে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এতে খরচও বাঁচবে এবং মানসম্মত খাওয়াও হবে।

তথ্যসূত্র
১) পানাম নগর – vromonguide.com
২) ঘুরে আসুন পানাম নগরী – bangla.jagoroniya.com
৩) পানাম নগর, হারানো শহরের খোঁজে একদিন – ekushey-tv.com
৪) ট্রাভেলগ, হারিয়ে যাওয়া পানাম নগরী – banglatribune.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *